Home / ধর্ম-দর্শন / মুসলিম রাষ্ট্রের প্রহরীদের সম্মান ও মর্যাদা

মুসলিম রাষ্ট্রের প্রহরীদের সম্মান ও মর্যাদা

এই সংবাদটি প্রিন্ট করুন
  •  
  •  
  •  

ভূমিকাঃ
মুসলিম রাষ্ট্রের সীমানা পাহারা দেয়া ও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ফযিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। এই গুরুদায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের জনগনকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা হয়। যেসব নিরাপত্তা বাহিনী এই কঠিন দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করবে মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে তাদের জন্য রয়েছে বিরাট প্রতিদান।
কেউ যদি শুধুমাত্র একদিন বা একটি রাত সীমানা পাহারা দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকে তাহলে তা একমাস সিয়াম পালন করা ও একমাস রাত জেগে নফল ইবাদত করার চাইতেও উত্তম। এই গুরুদায়িত্ব পালনের সময় কেউ যদি মারা যায় তাহলে সে শহীদ হিসাবে গণ্য হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তার এই আমলের সাওয়াব পেতে থাকবে। তাকে কবরের যাবতীয় ফিতনা ও আযাব হতে মুক্ত রাখা হবে এবং সে কবরে জান্নাত হতে রিযিক প্রাপ্ত হবে। নিম্নে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হল।

মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয়া অবস্থায় মৃত্যুবরনকারী ব্যক্তির সাওয়াব তাঁর মৃত্যুর পরও বৃদ্ধি পেতে থাকবেঃ

হাদীস নঃ ১
ওয়াসেলা বিন আসক্বা (রাঃ) হতে বর্ণিত। মহানবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’যে ব্যক্তি (ইসলামী শরীয়তে) উত্তম রীতি চালু করবে, যে পর্যন্ত সে অনুযায়ী আমল করা হবে, তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরেও সে অনুযায়ী সে তাঁর প্রতিদান পেতে থাকবে, যে পর্যন্ত কাজটি পরিত্যাক্ত না হয়। অপরদিকে যে ব্যক্তি মন্দ কাজ চালু করবে, সে তা পরিত্যাক্ত না হওয়া পর্যন্ত তার পাপের ভাগীদার হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি মুসলিম দেশের সীমানা পাহারারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে কিয়ামত পর্যন্ত পাহারা দেয়ার প্রতিদান পেতে থাকবে’’ সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৬৫ (আলবানি হাসান সহীহ বলেছেন)

দলীল নঃ ২
আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘’চারটি আমলের সাওয়াব মৃত্যুর পরও জারি থাকে। ১) যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, ২) যে ব্যক্তি মানুষকে ইলম শিক্ষা দেয়। তদানুযায়ী যা আমল করা হয়, তার সাওয়াব তার জন্য জারি থাকে, ৩) যে ব্যক্তি সদকায়ে জারিয়া করে। যতদিন ঐ সদকার উপকার জারি থাকবে ততদিন সাওয়াব পেতে থাকবে, ৪) যে ব্যক্তি এমন নেক সন্তান রেখে যায়, যে তার জন্য দু’আ করে’’ সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ১১৪ (আলবানি সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন)
মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয়া অবস্থায় মৃত্যুবরনকারী ব্যক্তিকে কবরের ফিতনা হতে নিরাপদ রাখা হবেঃ

হাদীস নঃ ৩
ফাদালাহ ইবন উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির সকল প্রকার কাজের উপর সীলমোহর করে দেয়া হয় (অর্থাৎ আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে)। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় পাহারাদানরত অবস্থায় যে লোক মৃত্যুবরণ করে, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর সাওয়াব বাড়ানো হতে থাকে এবং সে কবরের ফিতনা হতে নিরাপদ থাকে। রাবী বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে লোক নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করে, সে-ই প্রকৃত মুজাহিদ’’ তিরমিযি ১৬২১ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

হাদীস নঃ ৪
ফাদালাহ ইবন উবাইদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ”প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সীমান্ত প্রহরার সাওয়াব বন্ধ হয় না। কিয়ামত পর্যন্ত তার আমলের সাওয়াব বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সেই ব্যক্তি কবরের যাবতীয় ফিতনা হতে নিরাপদ থাকবে” আবু দাউদ ২৫০০ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

হাদীস নঃ ৫
ফাদালাহ ইবন উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’প্রত্যেক লোকের মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু যে লোক আল্লাহর পথে (কোনো কাজে) নিয়োজিত থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাঁর আমল নিঃশেষ হয়ে যায় না, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর আমল বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সে কবরের কঠিন আযাব হতে নিরাপত্তা লাভ করে’’ মিশকাতুল মাসাবীহ ৩৮২৩ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

হাদীস নঃ ৬
ফাদালাহ ইবন উবাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’প্রতিটি মৃত্যুগামী ব্যক্তির পরলোকগমনের পর তাঁর কর্মধারা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় পাহারারত ব্যক্তির নয়। কেননা তাঁর আমল কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত করা হবে এবং সে কবরের পরীক্ষা হতে নিষ্কৃতি পাবে’’ রিয়াদুস স্বালিহীন ১৩০০ (আলবানি হাসান বলেছেন)
একমাস সিয়াম পালন করা কিংবা রাত জেগে একমাস নফল ইবাদত করার চাইতেও একদিন অথবা একরাত সীমান্ত পাহারা দেয়া উত্তম। এরুপ ব্যক্তিকে মারা যাওয়ার পর কবরে তাঁর নিকট জান্নাত থেকে রিযিক পৌঁছে দেয়া হবেঃ

হাদীস নঃ ৭
মুহাম্মাদ ইবন মুনকাদির (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোনো এক সময় শুরাহবীল ইবনুস সিমতের সামনে দিয়ে সালমান ফারসী (রাঃ) পথ অতিক্রম করছিলেন। তখন তিনি তাঁর ঘাঁটিতে পাহারারত অবস্থায় ছিলেন। তাঁর ও তাঁর সাথীদের জন্য পাহারার কাজটি খুবই কঠিন মনে হচ্ছিল।
সালমান (রাঃ) বললেন, হে সিমতের পুত্র! আমি কি তোমাকে এমন একটি হাদীস বলবো, যা আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট থেকে শুনেছি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সালমান (রাঃ) বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘’একদিন আল্লাহ তায়ালার পথে সীমান্ত পাহার দেয়া একাধারে এক মাস সিয়াম পালন করা এবং রাতে নামায আদায় করা হতেও উত্তম ও বেশি কল্যাণকর। এই কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় যে লোক মৃত্যুবরণ করবে, কবরের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি হতে তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর আমল বর্ধিত করা হবে’’ তিরমিযি ১৬৬৫ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

হাদীস নঃ ৮
সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘’একটি দিবস ও একটি রাতের সীমান্ত প্রহরা একমাস সিয়াম এবং ইবাদতে রাত জাগার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আর যদি এ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে, তাতে তাঁর আমলনামায় সাওয়াব জারী থাকবে, যে আমল সে করতো। এবং তাঁর (শহীদসুলভ) রিযিক অব্যাহত রাখা হবে এবং সেই ব্যক্তি ফিতনাসমূহ থেকে নিরাপদ থাকবে’’ মুসলিম ৪৮৩২-(১৬৩/১৯১৩)

হাদীস নঃ ৯
সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘’একদিন ও একরাত সীমান্ত প্রহরায় রত থাকা একমাস ধরে (নফল) রোজা পালন তথা (নফল) নামাজ পড়া অপেক্ষা অধিক উত্তম। আর যদি এই অবস্থায় সে মৃত্যুবরন করে, তাহলে তাঁকে ঐ সমস্ত কাজের প্রতিদান দেয়া হবে, যা সে পূর্বে করতো এবং তাঁর বিশেষ রুজি চালু করে দেয়া হবে এবং তাঁকে (কবরের) ফিতনা ও বিভিন্ন পরীক্ষা হতে মুক্ত রাখা হবে’’ রিয়াদুস স্বালিহীন ১২৯৯ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

হাদীস নঃ ১০
সালমান ফারসী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘’আল্লাহর পথে একদিন বা একরাত সীমানা পাহারা দেয়া, একমাসের সাওম পালন করা ও সলাত আদায় করা হতে উত্তম। আর ঐ প্রহরী যদি এ অবস্থায় মারা যায়, তবে তাঁর কৃতকর্মের সাওয়াব অবিরত পেতে থাকবে। তাঁর জন্য সর্বক্ষণ (জান্নাত হতে) রিযিক আসতে থাকবে এবং সে কবরের কঠিন পরীক্ষা হতে মুক্তি পাবে’’ মিশকাতুল মাসাবীহ ৩৭৯৩ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

হাদীস নঃ ১১
সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘’যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় সীমানা পাহারায় রত থাকে একদিন বা এক রাত, তাঁর জন্য এক মাস রোজা রাখা ও ইবাদতের সাওয়াব রয়েছে। সে ইন্তেকাল করলেও এই আমল জারি থাকবে, আর সে সকল ফিতনা হতে রক্ষিত থাকবে। আর তাঁকে তাঁর রিযিক পৌঁছানো হবে’’ নাসায়ী ৩১৭২ (সনদ সহীহ)

হাদীস নঃ ১২
সালমানুল খায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিন ও একরাত সীমানা পাহারায় কাটায়, তাঁর জন্য একমাস রোজা রাখার ও ইবাদতের সাওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি পাহারার কাজে নিয়োজিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাঁর জন্যও ঐ সাওয়াব রয়েছে। আর তাঁকে জান্নাত হতে রিযিক পৌঁছানো হবে। আর সে সমস্ত ফিতনা হতে নিরাপদ থাকবে’’ নাসায়ী ৩১৭১ (আলবানি সহীহ বলেছেন)
পৃথিবীর যে প্রান্তেই যেসব নিরাপত্তা বাহিনী মুসলিম রাষ্ট্রের সীমানা প্রহরায় নিয়োজিত মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সকলের নেক আমল কবুল করুন।

About WNN

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *